খুলনার স্বাধীনতা এবং বীরত্বের কাহিনী - ২

মূলপেজ


লেখকঃ সাইফুল আলম চৌধুরী



৬ ডিসেম্বর সারাদিন যশোহরে তুমুল যুদ্ধ হয় অনেক রাত পর্যন্ত চলে দুইপক্ষের গোলাগুলি। মাঝ রাতের পরে হঠাৎ করেই পাকিদের পক্ষ থেকে গুলিবিনীময় বন্ধ হয়ে যায়। তবুও সতর্কতার জন্যে মুক্তিযোদ্ধারা রাতটুকু অপেক্ষা করে। ভোরের সুর্য্যের আলো ফুটতেই তারা প্লাবনের মত যশোহরে ঢুকে পড়ে। সমগ্র ক্যান্টনমেন্ট খুঁজে দেখে পাকিরা নেই। সব পালিয়েছে। ৭ ডিসেম্বর যশোহর মুক্ত হয়। আগেই বলেছি যেহেতু যশোহর ক্যান্টনমেন্ট ছিল ভারতীয় বর্ডারের কাছে সেহেতু যশোহর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকিদের খুব গুরুত্বপুর্ন ঘাঁটি। সেই দুর্ভেদ্য ঘাঁটির আকস্মিক পতনে সবাই অবাক হলেও সতর্ক থাকে। তারপর তারা পাকিদের পিছু ধাওয়া করে নওয়া পাড়ায় গিয়ে হামলা করে। ৯ ডিসেম্বর নওয়াপাড়া থেকে পিছু হটে পাকিরা খুলনার শিরোমনি গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে। রাস্তার উপরে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মাইন পুতে নিজেদের বুহ্যকে সুরক্ষিত করে তোলে।
পাঁচ কিলোমিটার ব্যাপী যায়গায় প্রায় পাঁচ হাজার সেনাবাহিনীর সাথে আর্টিলারি ও ট্যাংক বহর নিয়ে ঘাঁটি গড়ে তোলে। পাকবাহিনীর হাতে ছিল অজস্র এম-২৪ শেফি ট্যাংক, অগুনিত ফিল্ডগান, ১০৭ ব্রীগেড, ৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, আংশিক ২১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ১৫ এফ এফ আর, ২২ এফ এফ আর, ৫৫ ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্ট, ৭ এঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, ১০ এঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়ান আর জামায়াতে ইসলামির সদস্যদের সমন্ময়ে গঠিত কয়েকশত রাজাকার, আল-বদর, আল শামস। ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান ছিল তাদের নেতৃত্বে।
মেজর জেনারেল দলবীর সিং এর নেতৃত্বে ভারতীয় বাহিনী পাকিদের অবস্থান না বুঝেই কয়েকটা পুরাতন জ্বরাজীর্ন টি-২০ ট্যাংক নিয়ে ১০ ডিসেম্বর ঢুকে পড়ে সে বুহ্যের মধ্যে। ফলে যা হবার তাই। কয়েকশ ভারতীয় সৈন্যের মৃতদেহ ও কয়েক হাজার হতাহত সৈন্য এবং পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে যেতে হয় তাদের। তারপর তারা তাদের সৈন্যদের নিরাপদ অবস্থানে রেখে যুদ্ধের সমস্ত দায়ীত্ব ছেড়ে দেয় মেজর মঞ্জুর এর উপর। মেজর মঞ্জুর প্রস্তুত হন সেকেন্ড ইন কম্যান্ড লেফঃ হুদাকে সাথে নিয়ে।
যে কোনও যুদ্ধের স্ট্রাটেজি অনুযায়ী শত্রুবাহিনীর উপর হামলা করার আগে নিজেদের কমপক্ষে তিনগুন শক্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মুক্তি যোদ্ধাদের সেই পরিমান প্রস্তুতি ছিল না। অতএব প্রথাগত যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ হবে চারিদিক থেকে খন্ড খন্ড। ১৬ তারিখ পর্যন্ত মেজর মঞ্জুরের নেতৃত্বে রাত দিন একটানা খন্ড খন্ড যুদ্ধে পাকিদের বিভ্রান্ত ও ব্যাতিব্যাস্ত করে রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিদের আত্মসমর্পনের খবর পেয়েই মেজর মঞ্জুর তার জীবনের চরমতম সিদ্ধান্ত নেন। ১৬ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে লুঙ্গি পরে স্যান্ডো গেঞ্জী গায়ে দুই হাতে দুটো স্টেনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকি ট্যাংক বহরের ভেতরে। শুরু হয় হাতাহাতি পর্য্যায়ের যুদ্ধ। তারপর ট্যাংকের ভেতরের গানম্যানদের খুঁজে খুজে গুলি করে হত্যা করেন। স্তব্ধ হয়ে যায় পাকিদের ট্যাঙ্ক বহর। ১৭ ডিসেম্বরে সিদ্ধান্ত হয় আত্মসমার্পনের। যে ছবি এযাবৎ আমরা শুধু হলিউডের মুভিতেই দেখে এসেছি। টম ক্রুজ বা আর্নল্ড শোয়ার্জনিগারদের অভিনয়ে । আমাদের মেজর মঞ্জুর সেটা বাস্তবে দেখিয়েছেন।
বিশ্বের সমর বিশারদরা এই যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধ “এল আলামিন” এর সাথে তুলনা করেছেন। জার্মান মিলিটারি একাডেমিতে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়ান হয় মেজর মঞ্জুর শুধুমাত্র জয়বাংলা স্লোগানে ভর করে কিভাবে বিশ্বের অন্যতম ট্রেইন্ড আর্মির এক ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টকে ধ্বংস করে দেয়। হল্যান্ডের আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পে পড়ান হয় কোন স্ট্রাটেজিতে সেদিন মেজর মঞ্জুর পরাজিত করেছিল সুসজ্জিত পাকিদের। ভারতে পড়ান হয় দলবীর সিং পাকিদের হাতে মার খেয়ে কেন ফিরে আসল আর মঞ্জুর কেন জয়ী হল। বিশ্বের দেশে দেশে আর্মি ট্রেনিং স্কুলে বাংলার কিংবদন্তির গল্প হিসাবে পড়ান হয় “ দ্য ট্যাংক ব্যাটল অব শিরোমনি এবং একজন মেজর মঞ্জুরের কথা, সে সাথে খুলনার প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা।
১৬ ডিসেম্বর জেনারেল হায়াত খান যখন তার অধস্তনদের জিজ্ঞেস করছিলেন আমরা কতক্ষন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারব? তখন তার অফিসাররা উত্তর দিয়েছিল যে কোন আক্রমনের মুখে একমাস টিকে থাকার মত পর্যাপ্ত গোলাবারুদ আমাদের আছে। আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধেও বা হাতাহাতি যুদ্ধেও যে বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের বাকি ছিল তাও সেদিন দেখিয়ে দেওয়া হল। সেই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা শিরোমনিতে যুদ্ধোত্তর প্রায় পনের বছর পর্যন্ত অক্ষত ছিল যা আমরাও দেখেছি।
১৭ ডিসেম্বর খুলনার সার্কিট হাউজে পাকিরা আত্মসমর্পন করে তাদের চার হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনি নিয়ে। কিন্তু এর বাইরে আরও কয়েক হাজার সৈন্য ছড়িয়ে ছিল খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে। যেমন শীপইয়ার্ড, দাদা ম্যাচ, রূপসা, চানমারি, লবনচরা এবং খালিশপুরের শিল্পাঞ্চল দিয়ে কয়েক হাজার পাকি সৈন্য ২২ ডিসেম্বর পর্যন্তও যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছে।
বন্ধুরা বাংগালী জাতির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। আর সেই অবিস্মরনীয় ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ আমাদের এই খুলনাবাসিরই। তোমরা জাননা যে মুক্তি যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শহীদ আমাদের জেলা খুলনাতেই। দেড় লক্ষ জীবন শহীদ হয়েছে শুধু খুলনা জেলাতেই যা বাংলাদেশের আর কোনও জেলাতে হয় নি। ত্রিশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে শুধু একদিনে চুক নগরে।
এত বেশি আত্মত্যাগের পরেও আমাদের খুলনাই সব চেয়ে বেশি অবহেলিত। খুলনার অবহেলা বঞ্চনার কথা বলতে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আমি উম্মাদ হয়ে যাই। সেই ১৯৪৭ সালের পাক ভারত ভাগের সময় থেকেই খুলনা কিভাবে অবহেলিত একটু পর্যবেক্ষন করলেই খুলনার মানুষ হিসেবে আর সুস্থ্য থাকা যায় না। পাক-ভারতের সেই পর্ব আরেকদিন তোমাদের শোনাব।
বন্ধুরা তোমারা খুলনার নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা । খুলনার জন্য যারা আজীবন সংগ্রাম করে আসছে তোমারা তাদের উত্তরসুরি। তোমাদের দায়ীত্ব রয়েছে খুলনার জন্য সংগঠিত হয়ে কিছু করার। আমরা বুকের মধ্যে আগুন নিয়ে আমরা দূর পরবাসে বাস করি। আমাদের সর্বাত্মক সমার্থন থাকবে তোমাদের প্রতি। তোমরা খুলনা সম্পর্কে নিজে জান অপরকে জানাও। খুলনার অধিকার আদায়ের দাবীতে ফেটে পড় বিশ্বব্যাপী। জয় আমাদের হবেই। তোমাদের নেতৃত্বে খুলনা একদিন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবেই।
নিচে ইউটিউব ভিডিওতে দেখ খুলনার সার্কিট হাউজের মাঠে পাকিদের আত্মসমার্পনের দৃশ্য।